মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ১২:০১ অপরাহ্ন
ভাবুন, হঠাৎ ঝড় বা ভূমিকম্পে বন্ধ হয়ে গেল বিদ্যুৎ ও পানির সরবরাহ। দোকানপাট বন্ধ, যোগাযোগব্যবস্থাও অচল। ঘরে থাকা খাবার ফুরিয়ে গেলে কীভাবে চলবে পরিবারের সদস্যরা?
এমন পরিস্থিতিতে যেন অন্তত ৭২ ঘণ্টা নিজেদের প্রয়োজন নিজেরাই মেটাতে পারেন, সে জন্য নাগরিকদের আগাম প্রস্তুতি নিতে বলছে ইউরোপ ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশের সরকার।
গত ২২ অক্টোবর যুক্তরাজ্য ‘বি রেডি’ নামে তিন বছর মেয়াদি একটি জনসচেতনতামূলক প্রচারাভিযান শুরু করে। এতে নাগরিকদের অন্তত তিনদিনের প্রয়োজনীয় সামগ্রী ঘরে রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
একইভাবে জাপানও দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানাতে যাচ্ছে। অন্যদিকে, ফ্রান্স ২০২৫ সালের নভেম্বরে জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় ২০ পৃষ্ঠার একটি নির্দেশিকা প্রকাশ করেছে।
সরকারগুলোর এমন উদ্যোগের পেছনে রয়েছে একাধিক সংকট একসঙ্গে তৈরি হওয়ার আশঙ্কা। প্রাকৃতিক দুর্যোগের পাশাপাশি অন্য দেশের হামলা, সাইবার আক্রমণ কিংবা বিদ্যুৎ ও যোগাযোগব্যবস্থার মতো গুরুত্বপূর্ণ সেবা বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এছাড়া জ্বালানি সরবরাহ, ব্যাংকিং ও পরিবহনব্যবস্থাও অচল হয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের নর্থইস্টার্ন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ও দুর্যোগ মোকাবিলা বিশেষজ্ঞ ড্যানিয়েল অলড্রিচ বলেন, বড় ধরনের ঝড়ের কারণে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এতে ঘরবাড়ির পাশাপাশি ব্যাংকিং ও অর্থ লেনদেনের ব্যবস্থাও অচল হয়ে পড়তে পারে।
একই সময়ে সাইবার হামলা হলে সংকট আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। কারণ, বিদ্যুৎ ও যোগাযোগব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল পানি সরবরাহ, চিকিৎসাসেবা ও পরিবহণব্যবস্থা। ফলে একটি সেবা বন্ধ হলে এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়তে পারে অন্য খাতেও। এমনকি, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহেও দেখা দিতে পারে বিঘ্ন।
প্রথম ৭২ ঘণ্টা কেন গুরুত্বপূর্ণ
অলড্রিচের মতে, বড় ধরনের দুর্যোগের পর প্রথম ৭২ ঘণ্টায় সরকারের পক্ষে সবার কাছে জরুরি সহায়তা পৌঁছানো সম্ভব নাও হতে পারে। এসময় নিজেদের প্রয়োজন নিজেরাই মেটানোর প্রস্তুতি থাকতে হবে নাগরিকদের।
১৯৯৫ সালে জাপানের কোবে শহরে ভূমিকম্পের পর উদ্ধারকাজে প্রতিবেশী ও পরিবারের সদস্যরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। ধসে পড়া ভবনের নিচে আটকে পড়া অনেক মানুষকে তাঁরা নিজেরাই উদ্ধার করেন। ২০১১ সালের ভূমিকম্প ও সুনামির সময়ও স্থানীয় মানুষের পারস্পরিক সহযোগিতা দুর্যোগ মোকাবিলায় বড় ভূমিকা রেখেছিল।
এসব অভিজ্ঞতা থেকে দুর্যোগের সময় নিজেদের মধ্যে সহযোগিতা ও আগাম প্রস্তুতির গুরুত্ব সামনে এসেছে। বিশেষ করে নর্ডিক দেশগুলোর জরুরি প্রস্তুতির মডেলে জাতীয় নিরাপত্তা ও দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রত্যেক নাগরিকের দায়িত্বের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
দুর্যোগ, নাকি যুদ্ধের প্রস্তুতি
যুক্তরাজ্যের প্রচারাভিযান শুরু হয়েছে এমন সময়ে, যখন দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিং শত্রুভাবাপন্ন রাষ্ট্রগুলোর হুমকি, সাইবার হামলা ও নাশকতার বিষয়ে সতর্ক করেছেন।
অন্যদিকে, জাপান মূলত ভূমিকম্পের ঝুঁকি বিবেচনায় নাগরিকদের প্রস্তুত থাকার পরামর্শ দিচ্ছে। দেশটির নানকাই ট্রাফ অঞ্চলে বড় ভূমিকম্পের আশঙ্কা দীর্ঘদিনের।
ফ্রান্সের জরুরি নির্দেশিকায় যুদ্ধ, সাইবার হামলা এবং অন্য দেশের পক্ষ থেকে মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে বিভ্রান্তি তৈরির বিষয়গুলোও উল্লেখ করা হয়েছে। এদিকে, নাগরিকদের অন্তত ৭২ ঘণ্টার জরুরি সামগ্রী প্রস্তুত রাখার পরামর্শ দিয়েছে ইউরোপীয় কমিশনও।
ঘরে কী কী রাখতে হবে
নির্দেশনা অনুযায়ী, ঘরে পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ পানি, দীর্ঘদিন ভালো থাকে এমন খাবার, প্রয়োজনীয় ওষুধ, টর্চলাইট, অতিরিক্ত ব্যাটারি, প্রাথমিক চিকিৎসার বাক্স, রেডিও, মুঠোফোনের চার্জার ও কিছু নগদ টাকা রাখতে হবে।
পাশাপাশি পরিবারের শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি ও পোষা প্রাণীর জন্য প্রয়োজনীয় সামগ্রীও মজুত রাখতে বলা হয়েছে।
যুক্তরাজ্যে সরকারের এমন আহ্বানের পর জরুরি সামগ্রীর বিক্রিও বেড়েছে। বিবিসির তথ্য অনুযায়ী, দেশটির সুপারমার্কেট চেইন আইসল্যান্ডে এক সপ্তাহান্তে টিনজাত খাবারের বিক্রি ৪০ শতাংশ বেড়েছে।
একই সময়ে রবার্ট ডায়াসে রেডিওর বিক্রি বেড়েছে ১৬০ শতাংশ। অন্যদিকে, ম্যাপলিনে রেডিওর বিক্রি ৯২ শতাংশ, টর্চলাইটের বিক্রি ২৮৪ শতাংশ এবং পাওয়ার ব্যাংকের বিক্রি ১০৬ শতাংশ বেড়েছে।
অন্য দেশগুলোর প্রস্তুতি
নিউজউইকের ২৮ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কানাডা, জাপান, মেক্সিকো ও নেদারল্যান্ডসেও তিন দিনের জরুরি সামগ্রী রাখার পরামর্শ রয়েছে। সুইডেন ও নরওয়ে প্রায় এক সপ্তাহ এবং জার্মানি ১০ দিনের প্রস্তুতির কথা বলেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি ওয়েবসাইটেও কয়েক দিন চলার মতো খাবার, পানি ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী রাখার নির্দেশনা রয়েছে।
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিগুলোর জন্য আলাদা ৯০ দিনের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। দ্য গার্ডিয়ানের ২ নভেম্বরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ‘ফোর্ট্রেস আমেরিকা’ উদ্যোগের লক্ষ্য হলো, বাইরে থেকে সহায়তা না পেলেও গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটিগুলো যেন ৯০ দিন কার্যক্রম চালাতে পারে। তবে, এটি সাধারণ নাগরিকদের জন্য কোনো নির্দেশনা নয়।
তাহলে কি বড় বিপর্যয় আসছে
বিভিন্ন দেশের এসব উদ্যোগকে আসন্ন যুদ্ধ বা বড় কোনো বিপর্যয়ের নিশ্চিত পূর্বাভাস হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। আধুনিক জীবনে বিদ্যুৎ, পানি, ইন্টারনেট, ব্যাংকিং ও যোগাযোগব্যবস্থা পরস্পরের ওপর নির্ভরশীল। ফলে, একটি পরিষেবা বন্ধ হলে অন্যগুলোও ব্যাহত হতে পারে।
যুক্তরাজ্য সরকারও বলেছে, জরুরি প্রস্তুতি মানে একবারে বিপুল পরিমাণ খাবার বা পানি কিনে রাখা নয়। বরং ঘরে থাকা সামগ্রী দেখে প্রয়োজন অনুযায়ী ধীরে ধীরে জরুরি জিনিসপত্র যোগ করাই মূল উদ্দেশ্য।
সূত্র: টাইমস নাউ নিউজ