শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:৫৩ অপরাহ্ন

নির্বাচনের পরই শেষ হবে ইরান যুদ্ধ: ট্রাম্প

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ শেষ হয়ে যাবে বলে তিনি আশা করছেন। একই সঙ্গে, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনে আবারও হামলার হুমকি দিয়েছেন তিনি।

এমন এক সময়ে ট্রাম্প এই মন্তব্য করলেন, যখন ছয় মাস ধরে চলা সংঘাতের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান জাহাজ চলাচলকে কেন্দ্র করে সবচেয়ে বড় পাল্টাপাল্টি হামলা চালিয়েছে।

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনাও বেড়েছে।

বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) সৌদি আরবের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর খামিস মুশাইতে দেশটির বেসামরিক প্রতিরক্ষা কর্তৃপক্ষ ২৪ ঘণ্টার মধ্যে চতুর্থবারের মতো জরুরি সতর্কতা জারি করে। একই সময়ে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথিদের সঙ্গে সৌদি বাহিনীর সংঘর্ষও তীব্র হয়েছে।

এই পরিস্থিতির সরাসরি প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে। ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে রয়েছে। হরমুজ প্রণালি ও লোহিত সাগর- দুটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ দিয়েই জ্বালানি সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ফলে যুদ্ধ যত দীর্ঘ হচ্ছে, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের সরবরাহ ও দামের ওপর চাপও তত বাড়ছে।

বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) ইরান দাবি করেছে, হরমুজ প্রণালির কাছে তারা ১০টি জাহাজে হামলা চালিয়েছে। এর আগে যুক্তরাষ্ট্র পাঁচটি ইরানি তেলবাহী ট্যাংকার ডুবিয়ে দেয় বলে জানিয়েছে তেহরান। পাল্টাপাল্টি এই হামলা থেকে বোঝা যাচ্ছে, দুই পক্ষের মধ্যে দ্রুত যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা এখনো খুবই ক্ষীণ।

নির্বাচনের সঙ্গে যুদ্ধের সম্পর্ক দেখছেন ট্রাম্প

যুদ্ধ ও এর ফলে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় দেশে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা রেকর্ড নিম্নমুখী হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রেসিডেন্ট দাবি করেছেন, ইরান নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে। ওই নির্বাচনের মাধ্যমে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ রিপাবলিকান পার্টির হাতে থাকবে কি না, তা নির্ধারিত হবে।

বুধবার (৯ সেপ্টেম্বরর) সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, তার ধারণা, নির্বাচন শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই যুদ্ধ শেষ হবে। কারণ ইরান আর বেশি সময় ধরে টিকে থাকতে পারবে না এবং নির্বাচনে প্রভাব ফেলার জন্য তারা মরিয়া হয়ে উঠেছে। এর আগে অবশ্য যুদ্ধ শেষ করার বিষয়ে একাধিক সময়সীমা বেঁধে দিয়েছিলেন ট্রাম্প, কিন্তু সেগুলোর কোনোটিই স্থায়ী সমাধান আনেনি।

এদিকে, দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল পরে একটি প্রতিবেদনে জানায়, ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওসহ হোয়াইট হাউজের শীর্ষ উপদেষ্টারা ব্যক্তিগত আলোচনায় ট্রাম্পকে সতর্ক করেছেন যে এই সংঘাত প্রেসিডেন্ট হিসেবে তার বর্তমান মেয়াদের বাকি সময় পর্যন্তও চলতে পারে। ট্রাম্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ২০২৯ সালের জানুয়ারিতে।

ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন নিয়েও নতুন করে সতর্কবার্তা দিয়েছেন ট্রাম্প। ইরানের ক্ষতিগ্রস্ত নাতাঞ্জ ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ স্থাপনার কাছে অবস্থিত অত্যন্ত সুরক্ষিত এই এলাকায় ভূগর্ভে গভীরভাবে নির্মিত দুটি টানেল কমপ্লেক্স রয়েছে।

রিপাবলিকানদের মধ্যবর্তী নির্বাচন সম্মেলনে দেওয়া ভাষণে ট্রাম্প বলেন, পিকঅ্যাক্স এলাকায় কিছু তৎপরতা তার নজরে এসেছে। তিনি ইরানকে সতর্ক করে বলেন, তারা যেন কোনো ধরনের চালাকি না করে, কারণ প্রয়োজন হলে যুক্তরাষ্ট্র তাদের ওপর অত্যন্ত কঠোর হামলা চালাবে। জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময় থেকেই পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনে হামলার হুমকি দিয়ে আসছেন ট্রাম্প।

ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করে। এর অন্যতম কারণ ছিল তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে উদ্বেগ। তবে ইরান বরাবরই বলে আসছে, তাদের পারমাণবিক কার্যক্রম শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যেই পরিচালিত হচ্ছে।

গত কয়েক সপ্তাহে ওয়াশিংটন দাবি করে আসছিল, হরমুজ প্রণালি দিয়ে ট্যাংকার চলাচল ধীরে ধীরে বাড়ছে ও যুক্তরাষ্ট্র সফলভাবে জাহাজগুলোকে এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ দিয়ে পার করে দিচ্ছে। যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হতো। কিন্তু চলতি মাসে আবার সংঘাত শুরু হওয়ায় সেই পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়া বড় ধাক্কা খেয়েছে।

প্রাথমিক জাহাজ চলাচল-সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) হরমুজ প্রণালি দিয়ে মাত্র সাতটি জাহাজ অতিক্রম করেছে। এটি আগের ১০ দিনের দৈনিক গড়ের অর্ধেক। ফলে হরমুজের স্বাভাবিক নৌ চলাচল কবে পুরোপুরি ফিরবে, তা নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

হরমুজের পাশাপাশি ইয়েমেনের হুথিদের সঙ্গে সৌদি আরবের সংঘর্ষও গত কয়েক দিনে তীব্র হয়েছে। এটি মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সরবরাহের জন্য আরেকটি বড় ঝুঁকি তৈরি করেছে। কারণ লোহিত সাগর ও এর আশপাশের নৌপথেও সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) জানিয়েছিল, সাম্প্রতিক হুথি হামলায় খামিস মুশাইতসহ দক্ষিণ সৌদি আরবের চারটি শহরে অন্তত ৭৩ জন আহত হয়েছেন। হুথিরা দাবি করেছে, তারা খামিস মুশাইতের একটি বিমানঘাঁটি ও আশপাশের শহরগুলোর তেল অবকাঠামোয় হামলা চালিয়েছে। ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর পর সৌদি আরবে এটি ছিল হুথিদের সবচেয়ে বড় হামলাগুলোর একটি।

বৃহস্পতিবার খামিস মুশাইতে জারি করা সর্বশেষ জরুরি সতর্কতার পর সৌদি বেসামরিক প্রতিরক্ষা কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। তবে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল, লোহিত সাগরের নিরাপত্তা এবং ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর সক্রিয়তা—সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা এখনো বড় ধরনের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved bijoykantho© 2025