শুক্রবার, ৩১ Jul ২০২৬, ১০:৩৯ অপরাহ্ন
সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ওপর জোর দিয়েছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী এবং বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তার ভাষ্য, দেশে প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হলে ধর্মীয় অধিকারসহ সব নাগরিকের অধিকারই সুরক্ষিত থাকবে।
শুক্রবার (৩১ জুলাই) রাজধানীতে সনাতন পরিষদ আয়োজিত ‘সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা ও নিরাপত্তা বিধান’ শীর্ষক মতবিনিময় সভা ও প্রতিনিধি সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী বিজন কান্তি সরকার অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন।
বক্তব্যের শুরুতে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের শুভেচ্ছা জানিয়ে মির্জা ফখরুল বলেন, বাংলাদেশ বহু শতাব্দীর সম্প্রীতির দেশ। এখানে ধর্মের ভিত্তিতে বিভাজনের প্রশ্ন আসা উচিত নয়। এই ভূখণ্ডে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ধর্মের মানুষ একসঙ্গে বসবাস করে আসছেন।
তিনি জানান, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের মূল লক্ষ্য ছিল এ দেশের মানুষের স্বাধীনতা, মুক্তি ও অর্থনৈতিক মুক্তি নিশ্চিত করা। একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র গঠনের মধ্য দিয়ে মানুষের বিকাশের সুযোগ সৃষ্টি করাই ছিল সেই সংগ্রামের উদ্দেশ্য। কিন্তু স্বাধীনতার পর সেই গণতান্ত্রিক চেতনা ধরে রাখা সম্ভব হয়নি।
মির্জা ফখরুল উল্লেখ করেন, স্বাধীনতার পর দায়িত্বপ্রাপ্তরা গণতন্ত্রের পরিবর্তে একদলীয় শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তার মতে, দেশের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়ে তুলতে না পারা। গণতন্ত্র থাকলে নাগরিকের ব্যক্তিগত, ধর্মীয় ও সাংবিধানিক অধিকার সুরক্ষিত থাকতো।
সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিষয়ে সরকারের পদক্ষেপ তুলে ধরে তিনি বলেন, এই সরকার প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী হিসেবে একজনকে নিয়োগ দিয়েছে, যিনি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিষয়গুলো দেখভাল করছেন। এ নিয়ে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের সংগঠনের সঙ্গে একাধিকবার বৈঠক হয়েছে। সনাতন পরিষদের সঙ্গে এটাই প্রথম আনুষ্ঠানিক বৈঠক হলেও অন্য সংগঠনগুলোর সঙ্গে নিয়মিত আলোচনা হয়েছে।
বিএনপি অতীতে বিরোধীদলে থাকাকালে জন্মাষ্টমী ও দুর্গাপূজাসহ বিভিন্ন ধর্মীয় আয়োজনে অংশ নিয়েছে উল্লেখ করে মির্জা ফখরুল বলেন, এবার জাতীয় সংসদে নারীদের জন্য দেওয়া মনোনয়নের মধ্যে সনাতন ধর্মাবলম্বী, মতুয়া সম্প্রদায়, সমতলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সবাইকে নিয়ে রাজনীতি করার যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, সেটিকেই তাদের ‘৩১ দফার রেইনবো স্টেট’ ধারণা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সভায় উত্থাপিত বিভিন্ন সমস্যার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এর অধিকাংশই বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার আগের ঘটনা। সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সব ধর্মের মানুষের জীবন, সম্পদ ও ধর্মীয় অধিকার রক্ষায় সচেতনভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
স্থানীয় সরকারমন্ত্রী জানান, দুর্গাপূজার সময় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা পূজামণ্ডপে উপস্থিত ছিলেন, যাতে কোনো দুর্বৃত্ত সুযোগ নিতে না পারে। রথযাত্রাসহ বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠানে সরকার ও দলীয় নেতাদের উপস্থিতির কথাও উল্লেখ করেন তিনি। তার ভাষ্য, সরকারের উদ্দেশ্য হলো সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ যেন নিরাপদ বোধ করেন।
অতীত নিয়ে বেশি না ভেবে সামনে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে মির্জা ফখরুল বলেন, বারবার অতীতের নির্যাতনের প্রসঙ্গ টেনে আনলে এগোনো কঠিন হয়ে পড়ে। তবে তিনি অভিযোগ করেন, একটি মহল সচেতনভাবে ধর্মের নামে বিভেদ সৃষ্টির চেষ্টা করছে। এ বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি।
বিগত নির্বাচনে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সমর্থনের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে তিনি বলেন, তারা এই সম্প্রীতির পরিবেশ বজায় রাখতে চান।
নিজের নির্বাচনি এলাকার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, তার নির্বাচনি এলাকায় প্রায় এক লাখ ৩৫ হাজার সংখ্যালঘু ভোটার রয়েছেন এবং তিনি প্রায় এক লাখ ভোটের ব্যবধানে নির্বাচিত হয়েছেন। সেখানে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে তাদের সমস্যার সমাধানে কাজ করা হয়েছে।
সনাতন পরিষদের নেতাদের উদ্দেশে মির্জা ফখরুল বলেন, শুধু অভিযোগ করলেই হবে না, নিজেদের উপস্থিতিও দৃশ্যমান করতে হবে। ভবিষ্যতে প্রতিনিধিদের নিয়ে সরকারের সঙ্গে আলোচনায় বসার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, আলোচনা করেই সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সমাধানের চেষ্টা করা হবে।
সংখ্যালঘু শব্দ ব্যবহারের প্রসঙ্গে বিএনপির প্রয়াত চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বক্তব্য স্মরণ করে মির্জা ফখরুল বলেন, তিনি কখনো তাদের সংখ্যালঘু মনে করতেন না; বরং এই দেশের সমান অধিকারসম্পন্ন সন্তান হিসেবে দেখতেন। তিনি বলেন, নিজের অধিকার দাবি করতে হলে সেটি জোরালোভাবে তুলে ধরতে হবে।
দেশের বর্তমান পরিস্থিতি প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, ১৫ বছরে গণতন্ত্র ধ্বংস হয়েছিল। এখন আবার গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার সুযোগ এসেছে। সেই সুযোগ কাজে লাগানোর আহ্বান জানান তিনি।
বক্তব্যের একপর্যায়ে কাজী নজরুল ইসলামের কবিতার পঙ্ক্তি- ‘হিন্দু না ওরা মুসলিম? ওই জিজ্ঞাসে কোন জন? কাণ্ডারী! বল ডুবিছে মানুষ, সন্তান মোর মার’- উদ্ধৃত করে তিনি বলেন, বাংলাদেশের সব মানুষ একই মায়ের সন্তান। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ এবং জুলাই আন্দোলন- দুই ইতিহাসকেই ধারণ করে সামনে এগিয়ে যেতে হবে।
মির্জা ফখরুল বলেন, ১৯৭১-কে ভুলে যেতে চাওয়া মানুষ কখনো বাংলাদেশে বিশ্বাস করে না। একই সঙ্গে জুলাই আন্দোলনকেও অস্বীকার করা যায় না, কারণ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য বহু মানুষ প্রাণ দিয়েছেন এবং একটি ফ্যাসিবাদী সরকারকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করেছেন।
ধর্মের ভিত্তিতে দেশকে বিভক্ত করার বিরোধিতা করে মির্জা ফখরুল বলেন, উগ্রবাদ ও মৌলবাদকে কোনোভাবেই প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না। একটি উদারপন্থি ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্য নিয়েই সরকার কাজ করছে।