বৃহস্পতিবার, ০৭ মে ২০২৬, ০২:৪০ অপরাহ্ন

সমাজের চালিকাশক্তি হিসেবে রাজনীতি একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণে মুখ্য ভূমিকা পালন করে। আর সেই রাজনীতির অভিভাবক হিসেবে যাঁরা নেতৃত্বে থাকেন, তাঁদের আচরণ, ভাষা ও দৃষ্টিভঙ্গিই একটি জাতির চারিত্রিক কাঠামো গঠনে প্রভাব ফেলে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে আমাদের জাতীয় নেতৃত্বের একটি অংশ এখন ক্রমশ শিষ্টাচারহীনতা, অশ্রাব্য বাক্য বিনিময় এবং সহনশীলতাহীন রাজনৈতিক চর্চার ধারক হয়ে উঠছে। এই নেতিবাচক বাস্তবতা নতুন প্রজন্মের মধ্যে এক ধরনের গভীর হতাশা এবং অনীহার জন্ম দিচ্ছে।
নেতৃত্ব মানেই কি কুৎসা ও কটাক্ষ?
রাজনীতির মাঠে আজ অহরহ দেখা যাচ্ছে একজন নেতা অপর নেতাকে নিয়ে প্রকাশ্যে কুৎসিত ভাষায় মন্তব্য করছেন। কখনো ব্যক্তিগত আক্রমণ, কখনো পরিবারের সম্মান নিয়ে প্রশ্ন, আবার কখনো ইতিহাস বিকৃতি করে প্রতিপক্ষকে হেয় করার প্রতিযোগিতা চলছে। টেলিভিশনের টকশো থেকে শুরু করে জনসভা—সবখানেই রাজনৈতিক শিষ্টাচার হারিয়ে যাচ্ছে। জাতির সামনে এমন আচরণ এক ধরনের নৈতিক বিপর্যয়ের ইঙ্গিত দেয়।
নতুন প্রজন্মের মানসিক বিচ্ছিন্নতা-
বর্তমান তরুণ সমাজ রাজনৈতিক আগ্রহ হারাচ্ছে। তারা নেতৃত্বের মধ্যে নৈতিক উচ্চতা ও আদর্শ খুঁজে পায় না। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তারা প্রশ্ন তোলে—রাজনীতিতে কি এখন আর আদর্শ নেই? নেতৃত্ব কি শুধু ক্ষমতার দখল নিয়ে দ্বন্দ্বে সীমাবদ্ধ? এই প্রশ্নগুলো নতুন প্রজন্মকে রাজনীতিবিমুখ করে তুলছে, যা ভবিষ্যতের জন্য মারাত্মক হুমকি।
শিষ্টাচারহীনতার রাজনৈতিক ফলাফল-
শিষ্টাচারহীনতা নেতৃত্বের প্রতি আস্থা বিনষ্ট করে। মানুষ তখন নেতা নয়, ব্যক্তিস্বার্থে লিপ্ত চরিত্রগুলোকেই দেখতে পায়। রাজনীতির প্রতি এই বিতৃষ্ণা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকেই দুর্বল করে তোলে। রাজনৈতিক আদর্শের জায়গায় যদি বিদ্বেষ, রেষারেষি, অপমান আর প্রতিহিংসা স্থান পায়, তাহলে একটি জাতি কখনো ঐক্যবদ্ধ হতে পারে না।
সমাধানের পথ কোথায়?
নেতৃত্বের আসনে থাকা প্রত্যেক রাজনীতিবিদের উচিত introspection—আত্মসমালোচনা। নিজেদের আচরণ ও ভাষায় শালীনতা আনতে হবে। দলীয় নেতা-কর্মীদেরও প্রশিক্ষিত করে তুলতে হবে রাজনৈতিক শিষ্টাচার ও সহনশীলতার চর্চায়। মতের অমিল মানেই শত্রুতা নয়—এই শিক্ষাটিই রাজনৈতিক চর্চার কেন্দ্রে আনতে হবে।
নেতৃত্ব মানে অনুকরণীয়তা–
নেতৃত্ব শুধু শাসন নয়, আদর্শ স্থাপনও। জাতি তখনই এগিয়ে যায়, যখন নেতারা আদর্শে ও আচরণে অনুকরণীয় হন। জাতির জন্য যখন নেতারা উদাহরণ হয়ে দাঁড়ান, তখনই তরুণরা তাঁদের পথ অনুসরণ করে। অন্যথায় তারা মুখ ফিরিয়ে নেয়, যা একটি জাতির জন্য সবচেয়ে ভয়ংকর।
উপসংহার–
নেতৃত্বের শিষ্টাচারহীন আচরণ শুধু ব্যক্তি নয়, গোটা জাতিকেই পেছনে ঠেলে দেয়। আজকের তরুণেরা যদি রাজনীতিতে সম্মানিত আদর্শ না খুঁজে পায়, তবে ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব সংকটে পড়বে। তাই এখনই সময়—শিষ্টাচার, সহনশীলতা ও মূল্যবোধকে রাজনীতির কেন্দ্রে ফিরিয়ে আনার।