বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:১০ অপরাহ্ন
বিরোধীদলকে সম্পূর্ণ বাদ দিয়ে এবং তাদের সঙ্গে কোনো আলোচনা না করে ১৪ সদস্যের সংবিধান সংস্কার কমিটি গঠন করা নিয়ে সরকারের তীব্র সমালোচনা করেছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী। তিনি একে ফ্যাসিবাদের একটি লক্ষণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
দিলারা চৌধুরী বলেন, সরকার ও বিরোধীদল উভয়ই সংসদীয় ব্যবস্থার অংশ। এ ব্যবস্থায় নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে আইন প্রণয়ন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করাই স্বাভাবিক। কিন্তু বিরোধীদলকে সম্পূর্ণ বাদ দিয়ে একতরফাভাবে দেশ পরিচালনার চেষ্টা ফ্যাসিবাদেরই বহিঃপ্রকাশ।
বুধবার (২৮ অক্টোবর) জাতীয় প্রেস ক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির উদ্যোগে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় তিনি এসব কথা বলেন।
১৯৭২ সালের সংবিধান প্রসঙ্গে প্রশ্ন তুলে অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী বলেন, কার উদ্দেশ্যে ও কার ইঙ্গিতে ১৯৭২ সালের সংবিধান রক্ষায় এত তৎপরতা দেখানো হচ্ছে? ১৯৭২ সালের সংবিধান নিজেই প্রশ্নবিদ্ধ। কারণ, যে গণপরিষদের মাধ্যমে ওই সংবিধান তৈরি হয়েছিল, সেটি মূলত পাকিস্তানের সংবিধান রচনার জন্য নির্বাচিত হয়েছিল। পাকিস্তান ভেঙে যাওয়ার পর নতুন প্রেক্ষাপটে নতুন গণপরিষদ গঠন এবং গণভোটের মাধ্যমে সংবিধান অনুমোদিত হওয়ার কথা থাকলেও তা হয়নি। এই সংবিধানই পরবর্তী সময়ে কর্তৃত্ববাদী ও ফ্যাসিস্ট সরকারের জন্ম দিয়েছে।
সংসদে বিরোধীদলের ভূমিকা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে তিনি বলেন, সংবিধান সংস্কার কমিটিতে জনমত নেওয়ার নামে নির্দিষ্ট কিছু মানুষকে ডেকে মতামত নেওয়া হচ্ছে। অথচ সংসদে থাকা বিরোধীদল বা জোটের পক্ষ থেকে কোনো জোরালো বা দৃশ্যমান ভূমিকা দেখা যাচ্ছে না। বিরোধীদলকে কথা বলতে দেওয়া হয় না- এমন অভিযোগ থাকলেও অন্তত সংসদে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ জানানো বা সোচ্চার হওয়া উচিত ছিল।
আইজিপির ‘সরকার অনুমতি দিলে ক্রসফায়ার করা সম্ভব’- এমন বিতর্কিত মন্তব্যের তীব্র সমালোচনা করেন অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী। এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ‘আইজিপি ভোলাভালা মানুষ’ বলে মন্তব্য করে দায় এড়ানোরও কঠোর সমালোচনা করেন তিনি।
দিলারা চৌধুরী বলেন, আইজিপি কোনো ভোলাভালা ব্যক্তি নন। তিনি একজন চৌকস সরকারি কর্মকর্তা। তাঁর দায়িত্ব জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অন্যায় আদেশ না মানা। পুলিশ ম্যানুয়াল ও আইন অনুযায়ী, আইজিপির এ ধরনের কথা বলা বেআইনি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এমন হালকা মন্তব্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে।
সংবিধান সংস্কার কমিটির উচ্চকক্ষ ও নিম্নকক্ষ গঠনের প্রস্তাব নিয়ে তিনি বলেন, বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে উচ্চকক্ষ বা নির্বাচনপদ্ধতি গঠন করা উচিত। নিম্নকক্ষের অনুলিপি কখনো উচ্চকক্ষে নিয়ে যাওয়া অর্থহীন ও অপচয় ছাড়া কিছু নয়।
তিনি সতর্ক করে বলেন, নিম্নকক্ষ ও উচ্চকক্ষের ক্ষমতার ভারসাম্য এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা নিয়ে যে চিন্তাভাবনা চলছে, তার সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক পরিণতি হতে পারে।
অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী বলেন, ১৭ বছরের জুলুমের পর মানুষ যে পরিবর্তন এনেছে, তা থেকে শিক্ষা নিতে হবে। আবার হুটহাট অরাজকতা বা বিশৃঙ্খলা তৈরি হলে দেশের কোনো ইতিবাচক ফল আসবে না। তাই তরুণ সমাজ ও বিরোধীদলকে আরও সক্রিয় হয়ে সংসদ ও রাজপথে দৃশ্যমান ভূমিকা রাখতে হবে এবং নীতিনির্ধারকদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
মতবিনিময় সভায় আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু, মহাসচিব ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষারসহ আরও অনেকে উপস্থিত ছিলেন।