বুধবার, ১৫ Jul ২০২৬, ১১:৪৯ অপরাহ্ন

শিরোনাম :
স্থানীয় সরকার নির্বাচন: ভোটকেন্দ্রের চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ ২৭ আগস্ট মালয়েশিয়ায় কোনো ইসরাইলিকে পাওয়া গেলেই বহিষ্কার: আনোয়ার ইব্রাহিম ইউক্রেনের প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ মার্কিন হামলায় ইরানে ৩০ জনের বেশি বেসামরিক নাগরিক নিহত ফার্মের মুরগি পার্টি নামে ফেসবুক পেজ, দেওয়া হচ্ছে নানান বার্তা একটি বিশেষ দেশকে সুবিধা দিতে স্বৈরাচার শিক্ষা ও চিকিৎসা ধ্বংস করেছিল: সংসদে প্রধানমন্ত্রী এই সংসদ যত সুন্দর চলবে, মানুষের হতাশা তত দূর হবে: বিরোধীদলীয় নেতা পবিত্র আখেরি চাহার সোম্বা ১২ আগস্ট ২৪ ঘণ্টায় হাম ও উপসর্গে ৭ জনের মৃত্যু তিস্তার পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় নিম্নাঞ্চল প্লাবিত

একটি বিশেষ দেশকে সুবিধা দিতে স্বৈরাচার শিক্ষা ও চিকিৎসা ধ্বংস করেছিল: সংসদে প্রধানমন্ত্রী

পূর্ববর্তী ফ্যাসিবাদী ও স্বৈরাচারী সরকার ‘একটি বিশেষ দেশকে’ সুবিধা দিতে এবং একটি বিশেষ স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীকে খুশি করতে দেশের শিক্ষা ও চিকিৎসাব্যবস্থা সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দিয়েছিল বলে তীব্র সমালোচনা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

বুধবার (১৫ জুলাই) জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশনের সমাপনী বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল।

কোনো দেশের নাম না করে চিকিৎসা খাতের বেহাল দশা সম্পর্কে বলতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী তার পারিবারিক অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করে জানান, তার স্ত্রী যেহেতু নিজে একজন পেশাদার চিকিৎসক, সে কারণে চিকিৎসাব্যবস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বহু মানুষের বাস্তব ও মাঠপর্যায়ের ধারণা তিনি খুব কাছ থেকে পেয়েছেন।

তিনি সরাসরি অভিযোগ করে বলেন, স্বৈরাচারী সরকার বাংলাদেশের চিকিৎসাব্যবস্থাকে পরিকল্পিতভাবে পঙ্গু করে অন্য কারও হাতে তুলে দিয়েছিল এবং একটি বিশেষ দেশকে একচেটিয়া রোগী সরবরাহ ও চিকিৎসা বাণিজ্যের সুবিধা দেওয়ার জন্য আমাদের দেশের বড় বড় হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য পরিষেবাকে অকার্যকর করে রাখা হয়েছিল।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, কোনো জাতিকে ধ্বংস করতে হলে তার শিক্ষাব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দেওয়ার যে নীতি রয়েছে, বিগত স্বৈরাচারী সরকার অন্য কারও এজেন্ডা ও তাবেদারি বাস্তবায়নে মনেপ্রাণে সে নীতিই এদেশে প্রয়োগ করেছিল। একইভাবে দেশের চিকিৎসাব্যবস্থাকে পঙ্গু করে অন্য কোনো দেশের বাণিজ্যিক স্বার্থের হাতে যেন তুলে দেওয়া হয়েছিল, যার ফলে এদেশের কোটি কোটি মানুষ ন্যূনতম সুচিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হয়েছে।

তিনি এ দুই গুরুত্বপূর্ণ খাতের আমূল পরিবর্তন করে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে বর্তমান সরকার পর্যায়ক্রমিকভাবে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়ার মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে বলে জানান।

সংসদে দেওয়া প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে পূর্ববর্তী শেখ হাসিনা সরকারের বিভিন্ন নীতি ও একটি বিশেষ প্রতিবেশী দেশের প্রতি অতিরিক্ত তোষণ নীতির স্পষ্ট ইঙ্গিত ফুটে ওঠে। শিক্ষা খাতের করুণ চিত্র তুলে ধরে তিনি মিশরের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিখ্যাত দেওয়াল লিখনের ঐতিহাসিক উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, সেখানে পরিষ্কার করে লেখা আছে, কোনো জাতিকে যদি ধ্বংস করতে হয়, তবে অন্য কোনো অস্ত্রের প্রয়োজন নেই, শুধু তার শিক্ষাব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দিলেই চলে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই চরম ক্ষতিকর নীতিটি বিগত স্বৈরাচারী সরকার মনেপ্রাণে গ্রহণ করেছিল এবং এটি করা হয়েছিল অন্য কাউকে খুশি করার জন্য, বিশেষ কোনো গোষ্ঠী বা কোনো একটি বিশেষ দেশকে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন টাকার ব্যবসা ও একচেটিয়া সুবিধা দেওয়ার জন্য। তবে বর্তমান সরকার এই জাতীয়তাবিরোধী ধ্বংসাত্মক নীতির সম্পূর্ণ বিরোধী। দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সঠিক ও আধুনিক মানবিক শিক্ষায় গড়ে তুলতে এবং বিতর্কিত সিলেবাসগুলোকে সিলেবাস থেকে ধীরে ধীরে পুরোপুরি সরিয়ে আনতে সরকার কাজ শুরু করেছে।

তিনি বলেন, একই সঙ্গে শিক্ষার উপকরণ নিশ্চিত করা এবং যারা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে গড়ে তুলবেন, সেই শিক্ষকদের যুগোপযোগী সঠিক ও মানসম্মত প্রশিক্ষণের ওপর সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। মানসম্মত শিক্ষা ও উপকরণ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এবার বাজেটে শিক্ষায় সর্বোচ্চ বরাদ্দ রাখা হয়েছে এবং আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে শিক্ষা খাতে পর্যায়ক্রমিকভাবে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দ করার ঘোষণা দেন তিনি।

বাজেট উপস্থাপনের দিন বিরোধীদলীয় নেতার মন্তব্যকে সমর্থন জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিরোধীদলীয় নেতা বলেছিলেন আমাদের চিকিৎসাব্যবস্থা একশত ভাগ অসুস্থ, কিন্তু আসলে এটি ১০১ ভাগ অসুস্থ। এই মৃতপ্রায় চিকিৎসা খাতকে পুনরায় সচল করতে চলতি বাজেটে ১.২ শতাংশ বরাদ্দ রাখা হলেও আগামী পাঁচ বছরে তা জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে।

স্বাস্থ্য খাতের সংস্কারের পাশাপাশি দেশের প্রান্তিক ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় চিকিৎসাসেবা সহজ করতে এক বিশাল কর্মসংস্থান ও সেবামূলক কর্মযজ্ঞের ঘোষণা দেন সরকারপ্রধান।

তিনি জানান, উন্নত বিশ্বের মতো রোগ নিরাময়ের চেয়ে রোগ প্রতিরোধকে অগ্রাধিকার দিতে সারা দেশে খুব শিগগিরই এক লক্ষ ‘হেলথকেয়ার কর্মী’ নিয়োগের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হবে।

এছাড়া গ্রামীণ অঞ্চলের শিশুদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে সরকারের একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও মানবিক উদ্যোগের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যেই দেশের পাঁচটি বিভাগে ২০০ শয্যাবিশিষ্ট পাঁচটি অত্যাধুনিক শিশু হাসপাতাল চালু করা হবে। এর ফলে গ্রামীণ অঞ্চলের দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত পরিবারের শিশুদের উন্নত চিকিৎসার জন্য আর রাজধানীমুখী হয়ে চরম ভোগান্তি পোহাতে হবে না এবং তারা বিভাগীয় পর্যায়েই বিশেষায়িত শিশু স্বাস্থ্যসেবা লাভ করতে পারবে।

প্রধানমন্ত্রী বিগত স্বৈরাচারী আমলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল পরিদর্শনের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে বলেন, বিগত দেড় দশক ধরে রাজপথে ও গণমাধ্যমে শুধু তথাকথিত উন্নয়নের ফানুস ও গল্প শোনানো হতো। কিন্তু বাস্তবে আমি নিজে যখন দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় গিয়ে সাধারণ মানুষের সাথে সরাসরি কথা বলেছি, তখন সেই প্রচারণামূলক উন্নয়নের গল্পের সঙ্গে বাস্তবতার কোনো মিল খুঁজে পাইনি।

সিলেটের সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার বেহাল অবস্থার উদাহরণ টেনে সরকারপ্রধান বলেন, ঢাকা-সিলেট হাইওয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের কাজও অবহেলিত ছিল। তবে বর্তমান সরকার জনগণের দুর্ভোগ লাঘবে প্রতিটি সড়ক ও মহাসড়কের উন্নয়ন কার্যক্রম অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শুরু করেছে, যার সুফল দেশের মানুষ খুব দ্রুতই পেতে শুরু করবে।

বিগত দেড় দশকের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের সীমাহীন দুর্নীতি ও লুটপাটের ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই সময়ে কুইক রেন্টালের নামে ‘কুইক মানি’ বা কুইক দুর্নীতি অর্জনের এক মহোৎসব চালানো হয়েছিল, যার ফলে শুধু বিদ্যুৎ খাত থেকেই কমপক্ষে ৩ লাখ কোটি টাকা হরিলুট করে বিদেশে পাচার করা হয়েছে।

তিনি বলেন, কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে বসিয়ে রেখে কোনো কাজ না করিয়েও জনগণের করের টাকা থেকে প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকারও বেশি ক্যাপাসিটি চার্জ দেওয়া হয়েছে, যার ন্যূনতম সুফল দেশের সাধারণ মানুষ পায়নি। উপরন্তু, দেশের জ্বালানি খাতকে সম্পূর্ণ আমদানিনির্ভর করে ফেলা হয়েছিল এবং সংকটের জন্য কোনো আপদকালীন জ্বালানি মজুতের ব্যবস্থা রাখা হয়নি, যার ফলে দেশের হাতে মাত্র ৩০ দিনেরও কম জ্বালানি তেলের মজুত থাকতো।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের পর মাত্র তিন মাসের অক্লান্ত পরিশ্রমে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন বন্ধুপ্রতীম দেশের সঙ্গে সফল দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে বর্তমান সরকার জ্বালানি তেলের এই মজুতকে ৪৫ দিনের ওপরে নিয়ে গেছে এবং অদূর ভবিষ্যতে একে ৯০ দিনে উন্নীত করার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ চলছে।

দেশের প্রতিটি অবকাঠামোগত সংকট দূর করে একটি সম্পূর্ণ দুর্নীতিমুক্ত, স্বাবলম্বী ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved bijoykantho© 2025