শনিবার, ২৫ এপ্রিল ২০২৬, ০৪:১৯ অপরাহ্ন
ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে চলমান যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আরও তিন সপ্তাহ বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ওয়াশিংটনে দুই দেশের প্রতিনিধিদের সাম্প্রতিক বৈঠকের পর এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা কমাতে এটিকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
শুক্রবার (২৪ এপ্রিল) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় ট্রাম্প বলেন, বৈঠকটি খুবই ফলপ্রসূ হয়েছে।
তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্র লেবাননের সঙ্গে কাজ করে দেশটিকে হিজবুল্লাহর প্রভাব থেকে সুরক্ষিত রাখতে সহায়তা করবে। একই সঙ্গে তিনি ইঙ্গিত দেন, এই উদ্যোগ বৃহত্তর আঞ্চলিক কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার অংশ, যেখানে ইরান সম্পর্কিত বিষয়ও রয়েছে।
গত সপ্তাহে ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত বৈঠকের পর প্রথমবার যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করা হয়, যার মেয়াদ রোববার শেষ হওয়ার কথা ছিল। সাত সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চলা ইসরায়েল ও ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর সংঘাত বন্ধ করাই ছিল এর লক্ষ্য। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে সীমান্তজুড়ে হামলা-পাল্টা হামলার ফলে উত্তেজনা দ্রুত বেড়ে যায়।
সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প জানান, লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনজামিন নেতানিয়াহু শিগগিরই যুক্তরাষ্ট্র সফর করবেন।
তিনি বলেন, লেবাননের জন্য হিজবুল্লাহ একটি বড় চ্যালেঞ্জ এবং পরিস্থিতি স্থিতিশীল করতে যুক্তরাষ্ট্র কাজ করে যাবে।
বৈঠকে উপস্থিত লেবাননের রাষ্ট্রদূত নাদা হামাদেহ মোয়াওয়াদ এবং ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূত ইয়েখিয়েল লেইটার ট্রাম্পের মধ্যস্থতাকে গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন। লেইটার বলেন, লেবানন থেকে হিজবুল্লাহর প্রভাব কমাতে উভয় দেশ একসঙ্গে কাজ করছে।
যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও মাঠপর্যায়ে উত্তেজনা পুরোপুরি থামেনি। উভয় পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ করছে। বৃহস্পতিবার রাতে হিজবুল্লাহ দাবি করে, তারা উত্তর ইসরায়েলের দিকে রকেট ছুড়েছে, যা ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা বাহিনী প্রতিহত করেছে।
এর আগের দিন দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি বিমান হামলায় এক সাংবাদিক নিহত ও আরেকজন আহত হন। এ ঘটনায় লেবানন এটিকে যুদ্ধাপরাধ বলে অভিযোগ করলেও ইসরায়েল তা অস্বীকার করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রায় ৩০ বছরের মধ্যে ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে এ ধরনের সরাসরি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি, যা ভবিষ্যতে বড় ধরনের সমঝোতার পথ খুলে দিতে পারে।
সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ইরানে আঘাত হানার পর উত্তেজনা বেড়ে যায়। এর জবাবে মার্চের শুরুতে হিজবুল্লাহ ইসরায়েলের দিকে রকেট ও ড্রোন হামলা চালায়। পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় ইসরায়েল লেবাননের দক্ষিণাঞ্চল ও রাজধানী বৈরুতসহ বিভিন্ন স্থানে বিমান হামলা চালায় এবং সেখানে সেনা মোতায়েন করে।
লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এই সংঘাতে এখন পর্যন্ত অন্তত ২ হাজার ২৯৪ জন নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে নারী ও শিশু রয়েছে। তবে বেসামরিক ও যোদ্ধাদের আলাদা করে উল্লেখ করা হয়নি।
অন্যদিকে, ইসরায়েলের তথ্যমতে, হিজবুল্লাহর হামলায় কয়েকজন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন এবং লেবাননে অভিযানে অন্তত ১৫ জন ইসরায়েলি সেনা নিহত হয়েছেন।
জাতিসংঘের হিসাবে, এই সংঘাতের ফলে লেবাননে প্রায় ১০ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন, যা দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ। দক্ষিণাঞ্চলের বহু গ্রাম ও বসতবাড়ি ধ্বংস হয়ে গেছে।
হিজবুল্লাহ একটি শিয়া মুসলিম সশস্ত্র গোষ্ঠী এবং একই সঙ্গে একটি রাজনৈতিক দল, যা লেবাননের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রাখে। যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েলসহ বিভিন্ন পক্ষ এর নিরস্ত্রীকরণের দাবি জানালেও সংগঠনটি এখন পর্যন্ত অস্ত্র ত্যাগে আগ্রহ দেখায়নি।
লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন সতর্ক করে বলেছেন, জোরপূর্বক নিরস্ত্রীকরণ দেশে নতুন করে সহিংসতা ছড়িয়ে দিতে পারে এবং এ সমস্যার সমাধান কেবল আলোচনার মাধ্যমেই সম্ভব।
সব মিলিয়ে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানো হলেও স্থায়ী শান্তি এখনো অনিশ্চিত। কূটনৈতিক অগ্রগতি ও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার মধ্যে পার্থক্য থাকায় মধ্যপ্রাচ্যের এই সংকট দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে। সূত্র: বিবিসি