বৃহস্পতিবার, ২৭ অগাস্ট ২০২৬, ০৩:২৮ পূর্বাহ্ন
নেপাল ও চীনের তিব্বত সীমান্তবর্তী হিমালয় অঞ্চলে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় অন্তত ৯৫ জন নিহত হয়েছেন। এছাড়া এ দুর্ঘটনায় শত শত মানুষ এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। ক্ষতিগ্রস্ত নদীগুলোর নিম্নাঞ্চলে থাকায় ভারতের কয়েকটি এলাকাতেও বন্যার ঝুঁকি দেখা দিয়েছে বলে সতর্ক করেছেন কর্মকর্তারা।
কাদা, পানি ও ধ্বংসাবশেষের প্রবল স্রোত চীন ও নেপালের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত একটি নদীর তীর ভেঙে জনপদে ঢুকে পড়ে। এতে নেপালে ঘরবাড়ি, সড়ক, সেতু ও বিদ্যুৎকেন্দ্র ভেসে গেছে। অন্যদিকে, তিব্বতের কর্মকর্তারা বড় ধরনের প্রাণহানির আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
নেপালের ভোতে কোশি, ত্রিশূলী ও নারায়ণী নদীর তীর থেকে দূরে থাকতে কয়েকটি জেলার বাসিন্দাদের সতর্ক করেছে কর্তৃপক্ষ।
নেপালের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশের ২৯১ বিদেশিসহ মোট ৩৮৪ পর্যটক নিখোঁজ হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এছাড়া নেপাল সেনাবাহিনীর ৪৪ সদস্য ও পুলিশের ৩০ কর্মকর্তা নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানানো হয়েছে।
নেপাল পর্যটন বোর্ডের নিখোঁজ তালিকায় অন্তত একজন অস্ট্রেলীয় নাগরিকের নামও রয়েছে। বোর্ড জানিয়েছে, ওই ব্যক্তি কাঠমান্ডু হলিডে ট্যুরস অ্যান্ড ট্রাভেলস পরিচালিত একটি ভ্রমণ দলের সঙ্গে ছিলেন।
পর্যটন বোর্ডের কর্মকর্তাদের ধারণা, নিখোঁজদের বড় অংশই ভারতের নাগরিক ও ভারতীয় বংশোদ্ভূত তীর্থযাত্রী। তারা হিন্দুদের পবিত্র তীর্থস্থান তিব্বতের কৈলাস পর্বতে যাওয়ার পথে ছিলেন।
হিমবাহ থেকে বরফ-পাথরের ধসে বন্যার আশঙ্কা
প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, একটি হিমবাহ থেকে বরফ ও পাথরের ধস নামার পর ভোতে কোশির উপনদী লহেন্দে খোলা নদীতে হঠাৎ প্রবল ঢল নেমে এ আকস্মিক বন্যার সৃষ্টি হয়।
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নদীর উজানে এখনো পানির প্রবাহ বাধাগ্রস্ত রয়েছে। ফলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ক্ষতিগ্রস্ত নদীগুলোর নিম্নপ্রবাহে অবস্থান করায় ভারতের বিহার ও উত্তর প্রদেশেও বন্যা সতর্কতা জারি করা হয়েছে। রাজ্য দুটি নেপালের সীমান্তবর্তী এলাকায় অবস্থিত।
নেপাল পুলিশ জানিয়েছে, ক্ষয়ক্ষতির পুরো মাত্রা এখনো নিরূপণ করা সম্ভব হয়নি। উদ্ধারকর্মীরা জানিয়েছেন, পাহাড়ি রাসুয়া জেলার স্যাপ্রু বেসি ও তিমুরে এলাকায় নদীর পানি না কমা পর্যন্ত হেলিকপ্টার নামানো সম্ভব হয়নি।
নেপালের টেলিভিশনে সম্প্রচারিত ছবিতে দেখা গেছে, বন্যার পানিতে ঘরবাড়ি ধসে পড়েছে, গাড়ি ভেসে যাচ্ছে এবং একটি ধাতব সেতু প্রবল স্রোতে ভেসে গেছে। অনেক গ্রাম পানি, কাদা ও ধ্বংসাবশেষে তলিয়ে গেছে।
রাসুয়া জেলার প্রশাসক নরেন্দ্র পারিয়ার বলেন, প্রাণহানি ও সম্পদের ব্যাপক ক্ষতি হতে পারে। ভোতে কোশি নদীর তীরবর্তী বাসিন্দাদের দ্রুত উঁচু স্থানে সরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
রাসুয়ার স্বাস্থ্যকর্মী তুলা বাহাদুর বিক রয়টার্সকে বলেন, চারদিকে শুধু ধ্বংসযজ্ঞ দেখা যাচ্ছে। নদীর পাশের বসতিগুলো পুরোপুরি ভেসে গেছে। তাঁর নিজের পরিবারের পাঁচ সদস্যও নিখোঁজ রয়েছেন।
তিব্বতেও ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা
চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সিনহুয়া জানিয়েছে, নেপাল অংশে সৃষ্ট এই আকস্মিক বন্যার প্রভাবে সীমান্তবর্তী তিব্বতের শিগাতসে অঞ্চলে সড়ক যোগাযোগ, যোগাযোগব্যবস্থা ও বিদ্যুৎ সরবরাহ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং নিখোঁজদের খুঁজে বের করতে সর্বাত্মক তল্লাশি ও উদ্ধার অভিযান চালানোর নির্দেশ দিয়েছেন। পাশাপাশি ভবিষ্যতে দ্বিতীয় দফার দুর্যোগ এড়াতে পর্যবেক্ষণ ও আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা জোরদার করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
এদিকে, নেপালের জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, জলবিদ্যুৎকেন্দ্র ধ্বংস হওয়ায় দেশের বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
নেপালের প্রধানমন্ত্রী বলেন্দ্র শাহ জানিয়েছেন, পুলিশ ও সামরিক বাহিনীর সদস্যরা উদ্ধার অভিযানে অংশ নিয়েছেন। নিম্নাঞ্চলে বসবাসকারী মানুষদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নদীর তীরবর্তী বাসিন্দাদের বাড়তি সতর্কতা ও সজাগ থাকার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান