বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬, ০৩:১০ পূর্বাহ্ন
রাজধানীজুড়ে জ্বালানি তেলের সংকট দিন দিন তীব্র আকার ধারণ করছে। এ সংকটে জনজীবনে নেমে এসেছে চরম ভোগান্তি। পেট্রোল, অকটেন ও ডিজেলের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও মিলছে না কোনো নিশ্চয়তা। ফলে প্রতিদিন অপচয় হচ্ছে শত শত কর্মঘণ্টা, ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা এবং স্থবির হয়ে পড়ছে নগরজীবনের গতি।
বুধবার (১৫ এপ্রিল) রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, প্রায় প্রতিটি পেট্রোল পাম্পে বাস, মাইক্রোবাস, প্রাইভেটকার, অ্যাম্বুলেন্স ও মোটরসাইকেলের দীর্ঘ সারি। কেউ আগের রাত থেকে, কেউ ভোর থেকে, আবার কেউ সকালে এসে লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছেন। তবুও তেল পাওয়ার কোনো নিশ্চয়তা পাচ্ছেন না।
জ্বালানি তেল বিতরণে স্বচ্ছতা ও শৃঙ্খলা ফেরাতে ঢাকায় পরীক্ষামূলকভাবে মোটরসাইকেল চালকদের জন্য ‘ফুয়েল পাস’ অ্যাপ বা ওয়েবসাইট চালু করা হয়েছে। এ ব্যবস্থায় নিবন্ধনের মাধ্যমে ব্যবহারকারীরা একটি ইউনিক কিউআর কোড পাচ্ছেন, যা নির্দিষ্ট পেট্রোল পাম্পে স্ক্যান করে তেল সংগ্রহ করা যাচ্ছে।
জানা গেছে, ফুয়েল পাসধারী মোটরসাইকেল আরোহীরা সর্বোচ্চ ১ হাজার টাকার জ্বালানি তেল নিতে পারছেন। তবে সাধারণ মোটরসাইকেল ব্যবহারকারীরা পাচ্ছেন সর্বোচ্চ ৫০০ টাকার তেল।
রায়েরবাজারের বাসিন্দা আতাউর রহমান ভোরে ফজরের নামাজ শেষে মোটরসাইকেলে তেল নিতে বের হন। শাহবাগের একটি পাম্পে পৌঁছানোর আগেই দেখেন লাইনের শেষ প্রান্ত আজিজ সুপার মার্কেট ছাড়িয়ে পরীবাগ পর্যন্ত চলে গেছে।
ডিপো থেকে তেলের গাড়ি না আসায় সকাল সাড়ে ৯টা পর্যন্ত সরবরাহই শুরু হয়নি। পরে বেলা সোয়া ১১টার দিকে তেল দেওয়া শুরু হলে তখনও তিনি লাইনে অপেক্ষমাণ ছিলেন।
তিনি বলেন, ‘ভোরে বের হয়েছিলাম কাজে যাব বলে, কিন্তু দুপুরেও যেতে পারব কি না জানি না। সবকিছুই অনিশ্চিত হয়ে গেছে।’
নীলক্ষেত, কাঁটাবন, ঢাকা কলেজ ও শাহবাগ এলাকায় একই চিত্র দেখা গেছে। দীর্ঘ লাইনের কারণে অনেক সড়ক আংশিক দখল হয়ে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে।
এ প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে লালবাগের বাসিন্দা মাইনুল হোসেন বলেন, ‘গতকাল কয়েকটি পাম্প ঘুরেও তেল পাইনি। আজ আবার লাইনে দাঁড়িয়েছি। প্রচণ্ড রোদে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে অসুস্থ হয়ে পড়ছি।’
ঢাকা-গাজীপুর রুটের ভিআইপি পরিবহনের বাসচালক চাঁন মিয়া নীলক্ষেত মোড়ে বাস রেখে লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তিনি বলেন, ‘দুপুরের পর থেকে তেল দেওয়া শুরু হবে বলেছে। তাই সিরিয়াল দিয়ে বসে আছি। সবসময় বাস চালাতে পারি না, তাই আয়ও কমে গেছে।’
ইস্কাটনের হলি ফ্যামিলি হাসপাতালের সামনে অ্যাম্বুলেন্সচালক কামাল হোসেন জানান, তেল সংকটে তারা মুমূর্ষু রোগীদের নিয়ে দূরের পথে যেতে সাহস পাচ্ছেন না। কোথাও কোথাও সিএনজি গ্যাসেরও সংকট দেখা দিচ্ছে, যা পরিস্থিতি আরও জটিল করছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আন্তর্জাতিক অস্থিরতা—বিশেষ করে ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের প্রভাবে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটেছে। এর প্রভাবে দেশে ডিপো থেকে তেল সরবরাহ অনিয়মিত হয়ে পড়েছে। সময়মতো ও পর্যাপ্ত জ্বালানি না আসায় পাম্পগুলো গ্রাহকদের কোনো নিশ্চয়তা দিতে পারছে না।
বর্তমান পরিস্থিতিতে জনজীবনে সৃষ্টি হয়েছে বহুমাত্রিক চাপ—ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে কর্মঘণ্টা নষ্ট, পণ্য ও যাত্রী পরিবহন ব্যাহত, জরুরি যানবাহনও আটকে পড়ছে সড়কে তীব্র যানজট, গরমে অসুস্থতা এবং ভোগান্তি চরমে উঠছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সংকট দীর্ঘায়িত হলে জাতীয় উৎপাদনশীলতা হ্রাস পাবে। পরিবহন খাতের ধীরগতিতে সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হবে এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়তে পারে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যসেবা ও জরুরি সেবাও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, দ্রুত জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে জনভোগান্তি আরও বাড়বে এবং অর্থনীতিতে এর প্রভাব আরও গভীর হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. বদরূল ইমাম বলেন, ‘জ্বালানি সংকটের এই সমস্যা শুধু আমাদের দেশে নয়, এটি বৈশ্বিক সমস্যা। এখন জ্বালানি সাশ্রয়ী হওয়া একটি বড় উপায় যার মাধ্যমে কিছুটা হলেও স্বস্তি আসতে পারে। জ্বালানি ব্যবহারে কৃচ্ছ্রসাধন করা এখন জরুরি হয়ে পড়েছে। এছাড়া আর অন্য কোনো উপায় নেই।’
তিনি বলেন, চলমান এই সংকটে জ্বালানি তেলের অবৈধ মজুত করা অপরাধ। সরকারের আরও কঠোর নজরদারি বাড়াতে হবে। অবৈধভাবে মজুত করে উচ্চমূল্যে বিক্রি করার কিছু অবৈধ ব্যবসায়ী আছে। এ ধরনের লোকজন সাধারণ মানুষকে ভোগান্তির দিকে ঠেলে দিচ্ছে।